দুই সন্তানকে দাদির কাছে রেখে করো’না রো’গীর পাশে চিকিৎ’সক দ’ম্পতি

করো’নাকে মা খুব ভ’য় পেতেন। নয় বছর আ’র চার বছরের আমা’র ছোট দুটো বাচ্চা মায়ে’র কাছেই থাকত। আম’রা স্বামী-স্ত্রী’ দু’জনই করো’না রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছি- এ নিয়েও তিনি ভ’য়ে

থাকতেন। আমা’দের মাধ্যমে মা খুব সহ’জে ক’রো’নায় আ’ক্রা’ন্ত হতে পারেন। তাই করো’না পরিস্থি’তি যখন খা’রাপের দিকে যাচ্ছে, তখন বাচ্চাদে’র তাদের নানা’বাড়ি আর মাকে ভা’ইয়ের বাসা’য় রেখে আসি। ডা’য়াবে’টিস, প্রেশা’র আ’র হার্টের রোগী ছিলেন মা।

মা’য়ের যে’হেতু শা’রীরিক অবস্থা ভালো ছিল না, তাই কাছে যেতাম না। দূর থেকেই দেখে চলে

আস’তাম। আগস্টের ২২ তারিখ মা’য়ের হঠাৎ শ্বা’স’ক’ষ্ট শুরু হয়, আর তার আধ’ঘণ্টা’র মধ্যেই মা আমাদের ছে’ড়ে চ’লে যান। মা খুব ভ’য় পে’তেন, তাই ক’রো’নার নমুনা প’রী’ক্ষা করা হয়নি।

ডাক্তার হয়েও মা’য়ের শেষ সম’য়ে পাশে থাকতে পারিনি। ডা’ক্তা’র ছে’লে হিসেবে আ’মাকে মায়ের

প্র’য়োজন ছিল, কিন্তু আমি কিছু করতে পা’রলাম না।’- এভাবেই করো’নাকা’লীন মা’কে হা’রা’নোর কথা ব’লছিলেন চিকিৎসক মো. সাইদুল মোস্তাকিম।

ছোটবেলা থেকে মোস্তা’কিমের স্বপ্ন ছিল একজন মানবিক চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং সেই স্বপ্ন পূর’ণও করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৬ বছর ধরে নিরল’সভাবে মা’নুষকে’ চিকিৎসা’সেবা দিয়ে চলেছেন। করো’না মহামা’রি মোকা’বিলায় শুরু থেকেই তৎপর ছিলেন চট্ট’গ্রাম মে’ডিকেল

কলেজ হাসপাতা’লের ৪০তম ব্যাচে’র ছাত্র চিকিৎসক মো. সাইদুল মো’স্তাকিম ও তার চিকিৎসক স্ত্রী’ চট্টগ্রাম মেডিকেল’ কলেজ হাস’পাতা’লের রেডিওলোজি বিভাগের রেডিওলজিস্ট ডাক্তার উম্মে হানি।

চিকিৎসক মোস্তাকিম গত বছরে’র সে’প্টেম্বরে ক’ক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতা’লের ফা’র্মাকো’লজি বিভাগের বিভা’গীয় প্রধান হিসেবে বদলি হন।

এদিকে, কক্সবাজারে প্রথম ক’রো’না রো’গী শনা’ক্ত হলে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় কক্সবাজার সদর হাস’পাতা’লের করো’না আ’ইসো’লেশন সেন্টারে। সেখানে টানা সাত দিন স’রাসরি ক’রো’না রো’গীদের সেবা দিয়ে ১৪ দিনের কো’য়ারে’ন্টাইনে চট্টগ্রা’মে আস’ন।

ব্যক্তি’গত নি’রাপত্তায় ১৪ দিন কোয়া’রে’ন্টাইনে থা’কার কথা ছিল এ চি’কিৎসকে’র। কিন্তু ঝুঁ’কি জেনে’ও জীব’ন তুচ্ছ করে তিনি রো’গীর সেবায় এগিয়ে এ’সেছেন। ক’রো’নার ভ’য়ে সে সময়

অ’ধিকাংশ চি’কিৎসক তাদের ব্যক্তিগত চেম্বার বন্ধ রাখেন। অন্যদিকে, এ চিকিৎসক নগ’রীর হা’লিশ’হরে ব্যক্তিগত চেম্বারে নিয়মিত রোগী দেখেছেন। লক’ডাউ’নের সময়ে চেম্বারের পাশাপা’শি

টে’লিমে’ডিসিন সেবাও দি’য়েছেন। মানু’ষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে নিজ উদ্যোগে এলাকায় ৫০০ মাস্ক বিতরণ করেছেন এ চিকিৎসক। করো’না পজিটিভ না হলেও এ চিকিৎসক দম্পতি করো’না সা’সপেক্টটেড এবং ভাই’রাল কনজেক্টিভাইটিসে ভোগেন।

বর্তমানে ডাক্তার উম্মে হানিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতা’লে করো’না ইউনিটের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি ১৪ দিন দায়িত্ব পালন করবেন, ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকেন। এতে স্বামী ও সন্তানদের কাছ থেকে আবারও এক মাসের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন এই মানবিক ডাক্তার।

ডা. মোস্তাকিম বলেন, ‘শুরুর দিকে খুব বাজে অবস্থায় ছিলাম। আম’রা স্বামী-স্ত্রী’ দু’জনই করো’না রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের ভালোমানের প্রটেকশন বা পিপিই ছিল না বললেই চলে। বাসায়

ছোট ছোট দুটো বাচ্চা, অ’সুস্থ মা। শেষমেশ হঠাৎই মা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন! তারপরও চেম্বার করা বা রোগী দেখা বন্ধ করিনি। যখন ডাক্তাররা গণহারে আ’ক্রান্ত হচ্ছিলেন, তখন সময় কমিয়ে তিন দিন চেম্বার করতাম। যখন লকডাউন দেওয়া হয় আর যাতায়াতের সুযোগও বন্ধ, তখন টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে রোগীদের চিকিৎসা’সেবা দিয়েছি।’

এ পরিস্থিতিতে কখনও সরে যাওয়ার কথা ভেবেছেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সমকালকে

বলেন, ‘অবশ্য শুরুর দিকে ভ’য় লাগত। তবু এতটুকু পিছ পা হইনি। যতটুকু সম্ভব স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করেছি। ওই যে একটা আগ্রহ ছিল ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করার, মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়ার- সেটাই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেকেই জো’র করে ডাক্তারি পেশায়

আসেন। কিন্তু ছোটবেলা থেকে আমা’র প্রচণ্ড ইচ্ছা ছিল আমি ডাক্তার হবো। আমা’র বাবা-মায়েরও খুব ইচ্ছা ছিল। সেই ২০০৪ সাল থেকে এ পেশায় যু’ক্ত আছি। সুস্থ বা অ’সুস্থ যাই হই না কেন, একদিন তো ম’রতে হবে। আর মানুষের জন্য কাজ করে ম’রলেও শান্তি। আখেরাতে এর ফল অবশ্যই পাব।’

সঙ্গে যোগ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমা’র ছোট ছোট দুটো বাচ্চা গত চার-পাঁচ মাস ধরে মা-বাবা থেকে দূরে আছে। যেহেতু দুজনেই করো’না পজিটিভ রোগীদের সেবা করছি, চাইলেও বাচ্চাদের কাছে

যেতে পারছি না। দূরে রেখেও চোখের সামনে মা চলে গেলেন। নিজে ডাক্তার হয়েও মায়ের জন্য কিছু করতে পারিনি। দূর থেকে বাচ্চাদের চোখের দেখা দেখে আসি। বাচ্চা দুটো নানির কাছে। আম’রা

দুজনেই নিয়মিত রোগী দেখছি, চেম্বার করছি। এভাবেই চলছে দিন। পৃথিবীর এ দুঃসময়ে নিজেদের কাজকে যদি কাজে লাগাতেই না পারি তাহলে মানবজনম সার্থক হবে কেমন করে?’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *